ফিসফিস ধ্বনি, এই বাড়িডা না?
ধুস আওলা ঝাউলা লাগতাছে…
লোকটার দুই পা ফেটে রক্ত ঝরছে। সারা শরীর মৃত্যুর মতো যাতনা। অবিন্যস্ত কাচাপাকা দাড়ি থুতনির সঙ্গে লেপ্টে আছে লোকটার। ফের ঝাপসা দৃষ্টি দূরে প্রসারিত করতে করতে তার চোখে উজ্জ্বলতা খেলে যায়। হ্যাঁ, এটাই। এই বাড়িটাই।
মাটির বারান্দা ঘেরাও করে আছে নারকেল গাছের সারি। দেউড়ির পরে ছোট একটা বাগান। তার ওপারে আঁকাজোকা করা দরজা।
উত্তরের বাতাস লাফাতে লাফাতে আসে। ক্ষেতে গরুর পাল নিয়ে যাচ্ছে একটা ছেলে, কিন্তু পেছনের ল্যাংড়া বাছুরটা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। কাশতে কাশতে বাঁকানো দেহ নিয়ে সে বসে।
লাকড়ি পোড়ানো গন্ধ বাতাসে। লোকটার কোঁকড়ানো চামড়া ফুঁড়ে চাপচাপ রক্ত মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। প্রবল যন্ত্রণায় অবশ সে উপুড় হয়ে মাটি চেপে ধরে। নানা স্মৃতি মনে পড়ে তার—লোকটার। তার মনে পড়ে, বউয়ের কথা।
বউয়ের সঙ্গে খুনসুটির সেই দিনগুলো।
পোলা না মাইয়া?
ধুর! এমন বলে কেউ?
নিজেকে চিমটি কাটে সে, সত্যিই সে এই জীবনে বাড়ি ফিরতে পেরেছে! কত বছর পর? সে তার দীর্ঘ যুগের হিসেব মেলাতে যেন হিমশিম খায়। নিস্তব্ধ রাত ক্রমশ লোকটার মাথার ওপর ঝুলতে থাকে। ঘড়ির কাটার মতো দুলতে থাকে।
এবড়ো–খেবড়ো আল, মাঝখানে ডোবা, হোঁচট খেয়ে বাড়িটার সামনে এসে অনিশ্চিত বোধে ফিরে যাওয়া, বিভ্রমের সময় কতবার এমন হয়েছে! লোকটা ভাবে, কেউ কি হেঁটে আসছে? তার যুবক হয়ে উঠা সন্তান? তার সন্তান তো এখন যুবক—মায়াবী যুবক, তাই না?
লোকটার মনে পড়ে তার নিজের জীবনের কথা—আর কিছুদিন পরে পিতা হওয়ার কথা ছিল তার। নিজের যৌবনে কাউকে কিচ্ছু না বলে যুদ্ধে চলে গিয়েছিল সে, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্ত্রীর গর্ভে সন্তান রেখে এসেছে—এই চিন্তাও তখন তার মাথায় আসতে দেয়নি। এরপর গুলি খেয়ে বহু বছর কোথায় যে হারিয়েছিল, তা কি সে নিজেই জানে?
আলুথালু ভিড়ের মধ্যে হাঁটছিল লোকটা। আচানক তার করোটিতে হঠাৎ ভেসে উঠল যুদ্ধদিনের ভয়াল এক স্মৃতি। যুদ্ধের প্রহরে পতাকা হাতে নিয়ে যাচ্ছিল সে। স্টেনগানের নলের ভেতরে এক রকম গন্ধ থাকে, সেই গন্ধের মাদকতায় যেন সে ভুলে গিয়েছিল চারপাশ। যখন সম্বিত ফিরল, তখন দেখে তার হাতে থাকা পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে উল্লাস করছে কয়েকজন। আর তার সারাদেহে অবিরাম চলতে থাকল কিল–ঘুষি। ‘হালায় দেশের শত্রু।’—কে যেন বলছিল। কিন্তু লোকটা কে সে তখন তা আর ঠাওর করতে পারে না। তার স্মৃতির তন্তু ছিঁড়ে গিয়েছিল তখন থেকেই।
যৌবনকে সঙ্গে নিয়ে যে মানুষ যুদ্ধে গিয়েছিল, আজ তার সারা অস্তিত্বে ঘুণ। চামড়ার নিচে যেন কালো কালো যাতনার বিষ ছড়াচ্ছে। হোঁচট খেয়ে সামনে তাকায় লোকটা, ওই তো শিমুল গাছটি!
এত বছরে কিছুই বদলায়নি দেখে অনেক যাতনায়ও আপ্লুত হলো সে। ঘরের সামনে তুলো উড়বে, একসময় কত পানি দিয়েছে শিমুল গাছের গোড়ায়! আর শিমুলের সেই নেশা ধরে যাওয়া গন্ধ!
আহা! কী দিন ছিল!
সামনে দরজা খোলার শব্দ হলো কী? এত ঘোলাটে দৃষ্টি! কোমরে অসহ্য ব্যথা। কেউ কি হেঁটে আসছে?
সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার গলা দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ বের হতে চায়।
কিছুক্ষণ থেমে লোকটার যেন মনে পড়ে আরেক জীবনের স্মৃতি। মনে পড়ে যুদ্ধাহত অবস্থায় সে যখন হাসপাতালে, তখন তাকে শুশ্রষা দিয়েছিল স্টেলা রোজারিও নামের এক নারী। স্মৃতিভ্রষ্ট লোকটা সে সময় স্টেলা রোজারিওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকত। কারণ, তার কিছুই মনে পড়ত না। সে কেবল দেখত, সুবেশী এই নারীর ববকাট চুল। কাচাপাকা। স্টেলা তাকে বলত, পৃথিবীর যদি সীমান্ত না থাকত? পাখির মতো উড়তাম উড়তাম হে অচিন মানুষ! বলত, কোনো কিছু কি তোমার মনে পড়েছে? এসব বলে তার মাথা নিজের কোলের ওপরে নিয়ে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিত। তখন অদ্ভুত একটা নেশালু ঘ্রাণ আসত নাকি বয়স্ক সেই নারীকে পরি মনে হত!
লোকটা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকত তার দিকে।
নারী বলত, তোমার চোখ দেখছি খোসা ছাড়া বেতফলের মতো হয়ে উঠছে। আমার প্রেমে পড়ো না। এরপর বউয়ের সঙ্গে দেখা হলে কী উত্তর দেবে?
এই বউ বউ করে নারী যেন তার চেতনা ফিরিয়ে আনে। মনে পড়ে বকুলের দীর্ঘ চুলের কথা। লোকটা ছটফট করতে থাকে।
স্টেলা রেজারিওর স্মৃতি মুছে যায়।
আওয়াজ আসছে যে?
বারান্দার সিঁড়িতে বসে কে ঢুলছে? কিন্তু তার পাশে খাটিয়ায় সাদা রংয়ে আবৃত কার লাশ?
মাথা ঝিম ধরে তার। সে নিজের সন্তানের কথা ভেবে একটা পতাকা নিয়ে এসেছিল। ভেবেছিল, যুদ্ধদিনের কথাগুলো ছেলেকে বলবে। বলবে, গেরিলা যুদ্ধের কথা। তখন গেরিলা যুদ্ধের কথা শুনে বাবাকে ছেলের বীর মনে হবে। ছেলেকে শোনাবে রেডিওতে শোনা গান, জয় বাংলা, বাংলার জয়।
কিন্তু সে দেখেতে থাকে লাশ। লাশের পরে লাশ। দিনে দিনে লাশের সারি দীর্ঘ হয়। যুদ্ধের পর থেকে সে নিজেও কি লাশ হয়ে আছে?
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই অবস্থা হয়েছে?
অবশ্য একটা দেশের জন্মের পর ওই দেশে কিছুটা বিশৃংখল অবস্থা বিরাজ করে।
সেই বিশৃংখল অবস্থার মধ্যে একদিন অনেকগুলো হাত চড়াও হলো লোকটার ওপর। কেন হলো, লোকটা তা জানে না। তখন কি ঘুটঘুটে অমাবশ্যা ছিল? মনে পড়ে না। কিন্তু এটা মনে আছে, অনেকগুলো হাত ধেয়ে এসেছিল তার দিকে। এত হাত এত মেরেছিল লোকটাকে! সে ভেবেছিল, সেখানেই প্রাণ চলে যাবে। এখনো অবস্থা ভালো না। তারপরও সে কি স্বপ্নেও ভেবেছে, যে রাস্তা ধরে সে অনন্তের পথে চলে গিয়েছিল, সেই পথ ধরে ফের ফিরতে পারবে? স্বপ্ন দেখতে পারবে, স্ত্রী–সন্তান নিয়ে জীবনে ফিরে ফের সংসার করতে পারবে?
ওপরে আধখানা চাঁদ ফুটেছে, আমাকে বাঁচাও… বাঁচাও…। লোকটার ভেতর থেকে একটা বোবা চিৎকার ওঠে। পরমুহূর্তেই তা নেতিয়ে যায়। শিমুল আর কদমের ছায়া নিজের সঙ্গে একাকার হলে যেন শুয়ে শুয়ে সামনে এগোয় লোকটা, কেউ আছেন? কেউ কি আছেন?
সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে লোকটা।
ঘন ছায়া ফুঁড়ে এক মায়াবি যুবক প্রথমে বেরিয়ে আসে। বলে, ভিক্ষা হবে না, যান কাছের হাসপাতালে গিয়া চিকিৎসা লন।
এরপর যেন বায়স্কোপের দৃশ্যের মতো একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে—দেখা যায়, দরজার কপাট খুলে মাঝবয়েসী ফকফকা তার বউ। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন। দাঁড়ানো মানুষটাকে চল্লিশোর্ধ্ব লাগে। লোকটা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে, বকুল আমি আইছি…।
কে? মহিলার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, সে একটা মোমবাতি নিয়ে লোকটার মুখের সামনে তুলে ধরে। এরপর রীতিমতো কাঁপতে থাকে, তুমি বাঁইচা আছ? তুমার এই দশা হইছে? বলতে বলতে ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় নেয়। এরপর ফিসফিসিয়ে বলে,আমার অহন বিয়া হইছে,সন্তান হইছে…
ঘরের ভেতর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ শোনা যায়। লোকটার বুক পুড়ে যেতে থাকে। পেছনে দাঁড়ানো মানুষটা বকুল নামের নারীকে জিজ্ঞেস করে, এই পাগলটাকে তুমি চেনো?
বকুল বলে, আরেন্নাহ! আবোলতাবোল বকতেছিল।
বুড়াটা খুব অসুস্থ। বাদ দেও তো, বাবু কানতাছে, শুন না?
দরোজা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ দরোজা থেকে ফিরে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে এক মায়াবী যুবককে জড়িয়ে ধরতে চায় লোকটা। প্রশ্ন করে, তোমার নাম বিজয় না?
মহাতাজ্জব যুবক পাল্টা প্রশ্ন করে, আপনি ক্যামনে জানলেন?
লোকটার বুকে শিহরণ বয়ে যায়। বকুল তাহলে এই নামটা রেখেছে? সে ধীরে ধীরে ওই যুবকের চুল ঝাঁকিয়ে বলে, আসলে এই সব নাম বাচ্চা পেডে থাকতেই বাপ–মা আল্লাদ কইরা রাখে।
আপনি কার কথা বলতেছেন? কার বাপ–মা?
হাঁপাতে হাঁপাতে লোকটার যৌবনের অসাধারণ সুন্দর কদমের বাতাস উড়ে যাওয়া যাওয়া সুন্দর দিনগুলো মনে পড়ে। ভেসে যাওয়া নদীর মধ্যে নৌকার পাল তোলা খিলখিল হাসি মনে পড়ে। গ্রামের পুরুষের আর বিনোদন কী? সারাদিন কাজ শেষে বউয়ের যৌবনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। কাবিনের টাকায় কেনা এ এক দুর্লভ প্রাপ্তি, দুনিয়া ভুলে যায় কতজন!
বাবা! বাবা! বলে মায়াবী যুবক বিমূঢ় বোধ করলে লোকটার হাতটা কষে চেপে ধরে থাকতে থাকতে মুহূর্তটা এমন হয়, যেন এটা নিভে যাওয়া দীপের আগের মুহূর্ত। লোকটা বলে তুমি আমারে চিনছ? আহা! জীবন সার্থক হইল, বাবা! তোমারে একটু জড়ায়া ধরি?
আপনার শইল্যে তো অনেক রক্ত, চলেন আপনেরে হাসপাতালে নিয়া যাই।
না না, তুমি থাহো, আমার লগে।
মায়াবী যুবক অদ্ভুতভাবে হাসে। বলে, আমার বাপে যুদ্ধে যাওনের পরে পাকবাহিনী আম্মার পেটে লাত্থি দিয়া আমারে মাইরা ফালাইছে। এরপর থাইকা অপেক্ষায় আছি। ছায়ার মদ্যে, বাড়ির জমিন আর আসমান জুইড়া কবে আপনি আসবেন? অবশেষে আইলেন আপনি। আগে সুস্থ হন। পরে…
কথা বলতে বলতে মায়াবী যুবক ভালো করে দেখে লোকটাকে।
আপনার ডাইন হাতটা পাক আর্মি নিয়া গেছে? বাদ দ্যান, চলেন, আমি রিকশা ডাহি।
কিন্তু লোকটা তার সন্তানের মায়ার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। কিছুতেই সে যুবকের হাত ছাড়ে না। বহুকাল পরে লোকটা মন থেকে হাসে। আহ শান্তি! বলতে বলতে একসময় ওই হাত ধরেই সে অন্ধকারে স্থির হয়ে যায়।
এরপর যেন মায়াবী যুবকের লাশ খাটিয়ায় আধোছায়ায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় মাটির বারান্দায় পড়ে থাকে। এবং মায়াবী যুবক এবং বুড়ো লোকটাও ভিটের মায়ায় খাটিয়ার পাশে বসে ঢুলতে ঢুলতে পাহারা দেয়—অনন্ত পাহারায় বসে।
ধীরে ধীরে গভীর ভোর হয়।
মাদল বাজাতে বাজাতে বিজয়েরর গান গাওয়া ছেলে–মেয়েরা আসে, গান গাইতে গাইতে তারা চলে যেতে থাকে…